লোড হচ্ছে...
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা শত শত বছর পরও মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তেমনই একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা সৌদি আরবের তায়েফে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্...
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা শত শত বছর পরও মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তেমনই একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা সৌদি আরবের তায়েফে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর চালানো নির্যাতন।
ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে গিয়ে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল অপমান, প্রত্যাখ্যান ও শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু এত কষ্টের পরও তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে বেছে নিয়েছিলেন ধৈর্য, ক্ষমা ও মানুষের কল্যাণ কামনার পথ।
কেন তায়েফে গিয়েছিলেন মহানবী (সা.)?
ইসলামের দাওয়াত প্রচারের শুরুর দিকে মক্কার মানুষের একটি বড় অংশ মহানবী (সা.)-এর বিরোধিতা করত। মুসলমানদের ওপর চলছিল নানা ধরনের অত্যাচার।
এমন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর জীবনে আসে অত্যন্ত কঠিন একটি সময়। তাঁর প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) এবং তাঁর চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। তাঁদের হারানোর পর মক্কায় তাঁর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তখন তিনি মক্কার বাইরে অন্য মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
নবুয়তের দশম বছরে, আনুমানিক ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি তায়েফের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)।
তায়েফে কী ঘটেছিল?
তায়েফে পৌঁছে মহানবী (সা.) সেখানকার প্রভাবশালী নেতাদের ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি আশা করেছিলেন, তাঁরা সত্যের আহ্বান গ্রহণ করবেন অথবা অন্তত তাঁর কথা শান্তিপূর্ণভাবে শুনবেন।
কিন্তু ঘটেছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
তায়েফের নেতারা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। প্রচলিত সীরাত বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁরা কিছু লোককে তাঁর পেছনে লাগিয়ে দেন। তাঁকে অপমান করা হয় এবং পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
পাথরের আঘাতে মহানবী (সা.)-এর পা রক্তাক্ত হয়ে যায়। সীরাতের বর্ণনায় তাঁর জুতা রক্তে ভিজে যাওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর সঙ্গী যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন সীরাত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনিও আঘাত পান।
অবশেষে মহানবী (সা.) সেই এলাকা থেকে সরে গিয়ে একটি বাগানে আশ্রয় নেন।
প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও ক্ষমা করেছিলেন
তায়েফ থেকে ফিরে আসার পথে মহানবী (সা.) গভীর দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে ছিলেন।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিস অনুযায়ী, এই ঘটনার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.) এবং পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁর কাছে আসেন।
ফেরেশতা মহানবী (সা.)-কে জানান, তিনি চাইলে ওই লোকদের ওপর দুই পাহাড় একত্র করে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু মহানবী (সা.) প্রতিশোধ চাননি।
বরং তিনি আশা প্রকাশ করেন, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।
যারা তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করেছিল, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তিনি কল্যাণের আশা করেছিলেন।
এটাই ছিল মহানবী (সা.)-এর অসাধারণ ধৈর্য, দয়া ও ক্ষমাশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বাগানে আদ্দাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ
প্রচলিত সীরাত বর্ণনা অনুযায়ী, তায়েফে নির্যাতনের পর মহানবী (সা.) যে বাগানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটি ছিল উতবা ও শায়বা নামে দুই ব্যক্তির।
তাঁর কষ্ট দেখে তাঁরা আদ্দাস নামে একজন খ্রিষ্টান কর্মচারীর মাধ্যমে কিছু আঙুর পাঠান।
আদ্দাস যখন আঙুর নিয়ে আসেন, মহানবী (সা.) আল্লাহর নামে তা খাওয়া শুরু করেন।
এতে আদ্দাস বিস্মিত হন। তাঁদের কথোপকথনের একপর্যায়ে মহানবী (সা.) হযরত ইউনুস (আ.)-এর কথা উল্লেখ করেন। আদ্দাস জানতে চান, তিনি ইউনুস (আ.) সম্পর্কে কীভাবে জানেন।
মহানবী (সা.) তাঁকে নবীদের কথা জানান। সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, এ ঘটনার মাধ্যমে আদ্দাস তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।
তবে আদ্দাসের সঙ্গে সাক্ষাতের এই বিস্তারিত বিবরণটি সীরাতগ্রন্থে পাওয়া যায়; এটি সহিহ বুখারির ওই হাদিসের অংশ নয়।
তায়েফের ঘটনা থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়
এই ঘটনা শুধু একজন নবীর ওপর নির্যাতনের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের প্রতি দয়া, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাসের অসাধারণ উদাহরণ।
যারা মহানবী (সা.)-কে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তিনি তাদের জন্য ধ্বংস কামনা করেননি। তিনি আশা করেছিলেন, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্যের পথ অনুসরণ করবে।
আজও তায়েফের সেই ঘটনা মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়—কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করা, অন্যায়ের জবাবে ক্ষমাশীল হওয়া এবং মানুষের কল্যাণ কামনা করা কতটা মহৎ গুণ।
তথ্যসূত্র: [সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৩১]
[
Google AdSense Space
গুগল অ্যাডসেন্স অনুমোদনের পর এখানে বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হবে